তেলাপিয়া চাষে খাবার প্রয়োগের বিজ্ঞানসম্মত সঠিক নিয়ম ও সময়সূচী
প্রবন্ধের সংক্ষিপ্তসার
“তেলাপিয়া মাছের নার্সারি ও কালচার পর্যায়ে পোনার গড় ওজন অনুযায়ী সঠিক খাদ্য হার ও সময়সূচী নির্ধারণের মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় ও FCR কমিয়ে মাছ চাষকে লাভজনক করার সম্পূর্ণ নির্দেশিকা।”
ভূমিকা ও খাদ্যলোভী স্বভাবতেলাপিয়া মাছ অত্যন্ত খাদ্যলোভী (Voracious feeder) এবং অতি দ্রুত খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত। এ কারণে পুকুরে এদের দেহের ওজন অনুযায়ী পরিমাপ করে খাবার প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিয়মবহির্ভূত বা ইচ্ছামতো খাদ্য দেওয়া হয়, তবে অতিরিক্ত খাদ্য অপচয় হবে, পানির গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হবে, ক্ষতিকর গ্যাস বৃদ্ধি পাবে এবং FCR (Feed Conversion Ratio) ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। তাই তেলাপিয়া চাষকে লাভজনক করতে বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
১. নার্সারি পর্যায়ে খাবার প্রয়োগের নিয়ম (১-৫ দিন)০.২৫ থেকে ০.৩০ গ্রাম ওজনের পোনাকে দৈনিক দেহের ওজনের ৩০-৩৫% হারে নার্সারি পাউডার খাবার দিতে হবে। আবার ০.৪ থেকে ০.৫ গ্রাম ওজনের পোনাকে দৈনিক দেহের ওজনের ২০-২৫% হারে খাবার দিতে হবে। পোনা মজুদের পর প্রথম ৫ দিন এই নিয়মে দৈনিক ৩ বেলা সমান ভাগ করে খাবার প্রদান করতে হবে। প্রতি ৫ দিন পরপর পোনার নমুনা (Sampling) নিয়ে গড় ওজন নির্ধারণ করতে হবে এবং নতুনভাবে খাদ্যের পরিমাণ হিসাব করতে হবে।
২. নার্সারি পর্যায়ে খাবার প্রয়োগের নিয়ম (৬-৩০ দিন)(ক) ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম দিন: দেহের ওজনের ১৫-২০% হারে নার্সারি পাউডার, দিনে ৩ বেলা। (খ) ১১তম থেকে ১৫তম দিন: দেহের ওজনের ১৫-১৮% হারে ০.৫ মিমি ভাসমান (Floating) খাবার, দিনে ২ বেলা। (গ) ১৬তম থেকে ২০তম দিন: দেহের ওজনের ১২-১৫% হারে ১.০ মিমি ভাসমান খাবার, দিনে ২ বেলা। (ঘ) ২১তম থেকে ২৫তম দিন: দেহের ওজনের ১০-১২% হারে ১.৫ মিমি ভাসমান খাবার, দিনে ২ বেলা। (ঙ) ২৬তম থেকে ৩০তম দিন: দেহের ওজনের ৮-১০% হারে ১.৫ মিমি ভাসমান খাবার, দিনে ২ বেলা। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে ৩০ দিনে পোনা সাধারণত ৮০-১০০ লাইনে পৌঁছে কালচার পুকুরে ছাড়ার উপযোগী হয়।
| পর্যায় ও দিন | পোনার গড় ওজন (গ্রাম) | দৈনিক খাদ্য প্রদানের হার (% দেহের ওজনের) | খাবারের প্রকার ও সাইজ | দৈনিক খাবার সংখ্যা |
|---|---|---|---|---|
| ১ম – ৫মি দিন | ০.২৫ – ০.৫ গ্রাম | ২০% – ৩৫% | নার্সারি পাউডার ফিড | দিনে ৩ বেলা |
| ৬ষ্ঠ – ১০ম দিন | ০.৫ – ১.৫ গ্রাম | ১৫% – ২০% | নার্সারি পাউডার ফিড | দিনে ৩ বেলা |
| ১১ – ১৫তম দিন | ১.৫ – ৩.০ গ্রাম | ১৫% – ১৮% | ০.৫ মিমি ভাসমান খাবার | দিনে ২ বেলা |
| ১৬ – ২০তম দিন | ৩.০ – ৫.০ গ্রাম | ১২% – ১৫% | ১.০ মিমি ভাসমান খাবার | দিনে ২ বেলা |
| ২১ – ২৫তম দিন | ৫.০ – ৮.০ গ্রাম | ১০% – ১২% | ১.৫ মিমি ভাসমান খাবার | দিনে ২ বেলা |
| ২৬ – ৩০তম দিন | ৮.০ – ১২.০ গ্রাম | ৮% – ১০% | ১.৫ মিমি ভাসমান খাবার | দিনে ২ বেলা |
৩. কালচার পুকুরে খাবার প্রয়োগের বৈজ্ঞানিক নিয়মকালচার বা চাষের প্রধান পুকুরে প্রতি ১০ দিন পরপর মাছের স্যাম্পলিং করতে হবে এবং গড় ওজন নির্ধারণ করে নতুন বায়োমাস অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। কালচার পুকুরে সাধারণত মাছের ওজনের ওপর ভিত্তি করে ৩টি ধাপে খাদ্য ভাগ করা হয়: (ক) শুরু বা প্রারম্ভিক পর্যায় (১০-৫০ গ্রাম ওজন): দেহের ওজনের ৮% হারে ২৮% প্রোটিনযুক্ত ভাসমান বা ডুবন্ত পিলেট খাবার। (খ) মাঝামাঝি পর্যায় (৫০-১৫০ গ্রাম ওজন): দেহের ওজনের ৫% হারে ২৭% প্রোটিনযুক্ত খাবার। (গ) শেষ বা ফিনিশিং পর্যায় (১৫০-৪০০ গ্রাম ওজন): দেহের ওজনের ২.৫% হারে ২৬% প্রোটিনযুক্ত খাবার। প্রতিদিনের খাবার সকাল ও বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে সমান ২ বেলা ভাগ করে পুকুরে ছিটানো আবশ্যক।
৪. কালচার পুকুরে খাবার প্রয়োগের হার ও প্রোটিন টেবিলপুকুরে তেলাপিয়া মাছের মজুদ সংখ্যা এবং স্যাম্পলিং গড় ওজনের ওপর ভিত্তি করে নিচে কালচার পুকুরের দৈনিক খাদ্য গাইড উপস্থাপন করা হলো।
| মাছের বৃদ্ধির পর্যায় | মাছের গড় ওজন (গ্রাম) | দৈনিক খাবার প্রদানের হার (% বায়োমাসের) | প্রয়োজনীয় প্রোটিন মাত্রা (%) | খাবারের সাইজ ও ধরণ |
|---|---|---|---|---|
| প্রারম্ভিক (Early Phase) | ১০ – ৫০ গ্রাম | ৮.০% | ২৮% প্রোটিন | ১.৫ মিমি – ২.০ মিমি ভাসমান |
| মাঝামাঝি (Mid Phase) | ৫০ – ১৫০ গ্রাম | ৫.০% | ২৭% প্রোটিন | ২.০ মিমি – ৩.০ মিমি ভাসমান |
| শেষ ধাপ (Finish Phase) | ১৫০ – ৪০০ গ্রাম+ | ২.৫% | ২৬% প্রোটিন | ৩.০ মিমি – ৪.০ মিমি ভাসমান/ডুবন্ত |
৫. লাভজনক চাষের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও বিশেষ ব্যবস্থাপনাসমূহ(১) খাবার দেওয়ার আগে মাছের আহার গ্রহণের চঞ্চলতা বা প্রবণতা মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করুন। (২) অতিরিক্ত খাবার প্রয়োগ করলে পানির অ্যামোনিয়া বৃদ্ধি পায় এবং পানির পরিবেশ চরমভাবে বিনষ্ট হয়। তাই প্রতি ২০-২৫ দিন পরপর পুকুরে প্রতি শতকে ৩-৪ গ্রাম হারে গ্যাসোনাল (Gasonal) ছিটানো অত্যন্ত কার্যকর। (৩) মেঘলা আবহাওয়া বা পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কম থাকলে এবং মাছ পানির ওপর ভেসে খাবি খেলে সাময়িকভাবে খাবার বন্ধ রাখুন। তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে প্রতি শতকে ১৫-২০ গ্রাম অক্সিএড (Oxyadd) ট্যাবলেট প্রয়োগ করুন। নিয়মিত স্যাম্পলিং ও সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনাই তেলাপিয়া চাষে লাভজনকতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।
